#

Search


সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার শেষ বিদায় — পাহাড় হারালো এক আলোকিত শিক্ষককে

 

সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার শেষ বিদায়পাহাড় হারালো এক আলোকিত শিক্ষককে

 


পাহাড়ের নিসর্গ আজ নিস্তব্ধ। চারপাশে যেন এক অজানা শূন্যতা। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ হারানো স্কুল শিক্ষক সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার অকাল মৃত্যুতে গোটা পার্বত্যাঞ্চল শোকাহত। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষসবাই হারিয়েছে এক অনুপ্রেরণার বাতিঘরকে, যিনি সারা জীবন আলো ছড়িয়ে গেছেন অন্যের জীবনে।

 

একজন দায়িত্ববান শিক্ষক, একজন প্রিয় মানুষ

 

সেনা রঞ্জন ত্রিপুরা ছিলেন লোগাং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সততা, নিষ্ঠা দায়বদ্ধতার সাথে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর সহকর্মী শিক্ষার্থীরা বলেন, “স্যার শুধু পড়াতেন না, আমাদের মানুষ হতে শেখাতেন।

তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেননি, বরং জীবনবোধ, মূল্যবোধ মানবিকতার পাঠ শিখিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে কখনও ভয় নয়, বরং ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণার পরিবেশ বিরাজ করত।

 

সহকর্মীরা স্মরণ করেন, স্কুলে তিনি ছিলেন সময়নিষ্ঠ, দায়িত্ববান এবং সর্বদা হাসিমুখে সকলের সাহায্যে এগিয়ে আসা একজন মানুষ। বিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বা সামাজিক উদ্যোগযেখানে ভালো কিছু করার সুযোগ, সেখানেই তিনি ছিলেন সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তাঁর মৃত্যুর খবরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আজ নিস্তব্ধ, শিক্ষার্থীরা অঝোরে কাঁদছে প্রিয় স্যারের স্মৃতিতে।

 

বেপরোয়া গতির বলি আরেকটি জীবন

 

গতকাল বিকেলে, পানছড়ি উপজেলার লোগাং এলাকায় ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা একটি মোটরসাইকেল সড়কে থাকা সেনা রঞ্জন ত্রিপুরাকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি।

একটি মুহূর্তের অসচেতনতা কেড়ে নিল এমন এক মানুষের প্রাণ, যিনি শত শত শিক্ষার্থীর জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন প্রতিদিন।

 

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, কীভাবে বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিদিন আমরা হারাচ্ছি মেধাবী, কর্মঠ, সমাজের প্রয়োজনীয় মানুষদের। স্থানীয়রা বলেন, “যদি একটু সচেতন হতো চালক, হয়তো আজ স্যার বেঁচে থাকতেন।

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় নিয়ন্ত্রণহীন গতির এই সংস্কৃতি আজ মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছেএবং সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার মৃত্যু যেন আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ।

 

একজন আলোকিত জীবনের গল্প

 

সেনা রঞ্জন ত্রিপুরা ছিলেন এক আদর্শ শিক্ষক, একজন নিবেদিত সমাজকর্মী, এবং একজন সৎ মানুষ। তিনি পাহাড়ের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতেন নিঃস্বার্থভাবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বই সংগ্রহ, টিউশনের ব্যবস্থা, এমনকি অনেক সময় নিজের বেতনের টাকা থেকে সহায়তা করেছেন বলে জানায় তাঁর সহকর্মীরা।

 

তাঁর জীবনের মূল দর্শন ছিল—“জ্ঞানই হলো মুক্তির চাবি।

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করাকে গর্বের বিষয় মনে করতেন। বড় শহরে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, তিনি পাহাড়ে থেকে নিজের মাতৃভূমির সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্নে স্থির ছিলেন।

তাঁর ছাত্রছাত্রীরা বলেন, “স্যার সবসময় বলতেন—‘তোমরা যখন ভালো করবে, আমি তবেই সফল।আজ আমরা সফল হয়েও স্যারকে হারালাম।এই অকাল মৃত্যু তাদের হৃদয়ে এক অপূরণীয় ক্ষত তৈরি করেছে।

শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত লোগাং

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই লোগাং, পানছড়ি খাগড়াছড়ি এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মরদেহ যখন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়, তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থী, সহকর্মী অভিভাবকরা।

তাঁর জানাজা বা শেষকৃত্যে এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষ, প্রশাসনের প্রতিনিধি, শিক্ষক সমাজ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সবাই একস্বরেই বললেন—“পাহাড় হারালো এক জ্বলন্ত নক্ষত্রকে।

শিক্ষার্থীরা স্যারের ব্যবহৃত টেবিল, চেয়ার, এমনকি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আজও বিশ্বাস করতে পারছে নাতাঁর প্রিয় শিক্ষক আর ফিরে আসবেন না।

বিদ্যালয়ের একটি দেয়ালে বড় করে লেখা হয়েছে

স্যার, আপনি নেই, কিন্তু আপনার শিক্ষা, ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণা চিরকাল থাকবে আমাদের মাঝে।

সমাজের আহ্বান: সচেতনতা দায়িত্ববোধ

সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। প্রতিদিন রাস্তায় এমন অসচেতন আচরণের ফলে অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

এখন সময় এসেছে ব্যক্তি সমাজদুপক্ষকেই সচেতন হওয়ার। চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার মানসিকতা গড়ে তোলা, নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার দাবি তোলা এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

যদি আমরা এখনই পরিবর্তন না আনি, তাহলে সেনা রঞ্জনের মতো আরও অনেক আলোকিত মানুষ হারিয়ে যাবে আমাদের অমনোযোগিতা বেপরোয়া গতির কারণে।

 

শেষ শ্রদ্ধা

সেনা রঞ্জন ত্রিপুরার মতো মানুষ একদিনের জন্য হারিয়ে যান নাতাঁরা থেকে যান তাঁদের কাজের মাধ্যমে, শিক্ষার্থীদের মনে, সমাজের প্রতিটি অনুপ্রেরণার গল্পে।

তাঁর স্মৃতি আজ শুধু লোগাং নয়, পুরো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জনপদের গর্ব।

তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হবে না, কিন্তু তাঁর শিক্ষা আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাবে আলো হয়ে।

 

শিক্ষকের মৃত্যু হয় না, তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শেখানো প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে।

 

শান্তিতে ঘুমান সেনা রঞ্জন ত্রিপুরা স্যারআপনার আলো নিভে যায়নি, শুধু দূরে গেছেন একটু।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url